ক্লান্তি ছুঁতে পারে না গারো নারীদের

গারো জনগোষ্ঠীর সমাজ কাঠামো এবং জীবন জীবিকায় নারীদের কষ্ট সহিষ্ণু মনোভাব তাদের আত্ম প্রত্যয়ী করে তুলেছে। পরিবারের সর্বোতকৃষ্ট দায়িত্বটি নারীরা পালন করেন। গারো নারীদের, সন্তান কোলে পিঠে বেঁধে কাজ করা এবং জোজায় গাছের ছাল বেঁধে তা কপালে ঝুলিয়ে পণ্য নিয়ে মাইল্লের পর মাইল পথ বয়ে চলার দৃশ্য প্রমান করে গারো নারীদের কষ্টসহিষ্ণুতা। এই জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনায় নারীর একটি বিশেষ মাত্রা রয়েছে, যা নারীদের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বকে ইঙ্গিত করে। পরিবার পরিচালনা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নানা পন্থা নির্ণয়ে গারো নারী বিশিষ্ট। তারা পরিবার ও সমাজে পুরুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে দেখা যায়। তারা দায়িত্বের প্রতি এতই যত্নশীল যে, ঘরে মাঠে এবং হাট বাজারে সমান ভাবে কাজ করে। গারো পুরুষেরা কখনও কখনও অলস জীবন যাপন করলেও গারো নারীদের যেন ক্লান্তি ছুঁতে পারে না। গারো নারীরা তাদের কাজে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশী আন্তরিক ও সচেতন।
গারোদের জীবন জীবিকায় নারীর উপস্থিতি প্রবল ভাবে বিদ্যমান। ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভুমি কর্ষণ, বীজ তলা তৈরি, বীজ বুনা, ফসলের যত্ন, জৈব সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, ফসল উৎপাদন তা নারীরাই নিরূপণ করে থাকেন। কৃষি জমিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা এক সাথে কাজ করে। এখনও কখনও নারীরাই বেশি কাজ করে। ক্ষেত্রে খামারে উৎপাদিত শস্য নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে পণ্য বাজারে নিয়ে আসা এবং পাহাড় ও মাঠ থেকে ফসল আনার মত কঠিন কাজ করে নারীরা। উৎপাদিত পণ্য নিয়ে দূরের কোন হাটের গন্তব্যে যেতেও তারা অলসতা করেনা। গৃহকাজে ব্যবহাৰ্য পণ্যসামগ্রী, হাতে তৈরি জিনিসপত্র, হাঁস মুরগী, লাকড়ি সহ নানা প্রকার জিনিসপত্র নিয়ে তারা বাজারে আসে । হাটে বাজারে এবং দোকানে তৎপরতা থেকেও গারো নারীর বিশিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়। জুমচাষেও নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে।
গারো নারীরা ঘর গৃহস্থালী, সন্তান লালন পালন, চাকুরি, ব্যবসা, নদী ও খনি থেকে কয়লা ও পাথর উত্তোলন, কুটির শিল্প, এনজিও কার্যক্রম, সংগঠন পরিচালনা, সামাজিক কাৰ্য্যক্রম এবং পরিবার পরিচালনায় অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। ঋতু পরিবর্তনের সাথে নতুন ফতুর উপকরণের খুজেও ব্যস্ত থাকে তারা । দেখা গেছে সংসারের পুরুষ অলস দিন পার করে নানা স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নারীরা মাঠে বা অফিসে কাজ করার সময় সন্তান কোলে পিঠে বেধেই কাজ করছে। সন্তান জন্মের পর থেকে বেড়ে ওঠা, লালন পালন, খাবার তৈরি, পোশাক আচ্ছাদন এবং তাদের লেখাপড়ায় গারো নারীরা সদা তৎপর। ক্লান্ত পরিশ্রান্তির মাঝেও কখনওই সন্তানকে চোখের আড়াল করতে চাননা।
গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক সে কারণে মেয়েরাই সম্পত্তির অধিকারী হয়। কারো মেয়ে সন্তান না থাকলে বোনের মেয়ে উত্তরাধিকারী হয়। গারোরা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের ব্যক্তি স্বত্বার অধিকারী মনে করে না। তাদের সমাজে মনোগামী বিবাহরীতি অধিক লক্ষণীয়। প্যারালাল কাজিন বিবাহ নিষিদ্ধ তবে ক্রস কাজিন বিবাহ অনুমোদিত রয়েছে। নুবিজানী ফ্রেন্ডরিক এন্ডেনস দু’শো বছর আগে গারোদের মাতৃতন্ত্রীয় ধারার কথা উল্লেখ করেছেন। জনলির্ধারণের ক্ষেত্রে মায়ের দিক থেকেই বিষয়টি সুনিশ্চিত হওয়া যায়। একটি স্তরের পূর্ব পর্যন্ত নারী পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ছিল বিয়ের ধারণা ছিল না ফলে সন্তানদেব পিতৃত্ব নির্ধারণ করাও কঠিন ছিল তখন মায়ের পরিচয়ে সন্তান বড় হত। সন্তানের সঙ্গে মায়ের শারিরীক যোগসূত্র এবং পরবর্তী সময়ে পিতার সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয়। পিতার সাথে সম্পর্কের বিষয়টি সামাজিক ভাবে অনেক পরে স্বীকৃত হয়েছে। মাতৃতন্ত্রীয় সস্পর্কে জানা যায় যে, একে অপরের সঙ্গে অথবা গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকতো এতে অনেক পুরুষের মৃত্যু হত ফলে সম্পত্তির মালিকানা সমস্যা তৈরি হত। নারীরা ঘরে থাকত এবং বাড়িতে থেকে সম্পত্তি দেখাশোনা করতে পারবে, এজন্য নারীকে সম্পত্তির মালিকানা দেয়া হয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায় একপর্যায়ে এসে তাই বোনদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ হয়। সে সময় থেকেই গোত্রীয় রূপান্তর ঘটে এবং গোত্র তৈরি হয় এবং মায়ের দিক দিয়ে রক্ত সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়ের সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী গড়ে ওঠে যাদের নিজেদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ হয়। ক্রমান্বয়ে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে সাধারণ প্রতিষ্টান মারফত সংহতি তৈরি হয় এবং একই জাতির অন্যান্য গোত্র থেকে পৃথক হতে শুরু । গারো সমাজেও এ অবস্থা থেকে মাতৃতন্ত্রীয় ধারা আবহাওত থাকে। নারীর দিক থেকে আত্মভোত্ত্বীতা নির্ধারিত হয়। গোত্রের নাম, সামাজিক ও রাজনৈতিক পদবী মায়ের দিক থেকে হয়। তিন প্রজন্মের নারীদের নিয়ে মাতুচ্ছেদ তৈরি হয়। মায়ের বংশ সফল ছাবর অথার্ৎ সম্পত্তির মালিক হয়।
গারো সমাজ কাঠামোর উল্লেখযোগ্য দিক “মাহারিরাদ”। মাহারীর কৰ্তৃত্বে পরিবার পরিচালিত হয়। মাহারীঝাদ মাতৃতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় বহন করে। তাই সহাদরো মায়ের চটিং (Sept) ও মাহারী (Motherhood) এর পরিচয়ে বড় হয় এবং মায়ের বংশ ও পদবীর মাধ্যমে তারা পরিচিত হয়। মাতুসূূত্র রীতিতেই তারা একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। পরিবারের সম্পত্তি যাতে বাইরে না যায় এজন্য মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ধরে রাখা হয়েছে। মেয়েরা মায়ের সকল সম্পত্তির অধিকারী হয়। পুরুষের কোন সম্পত্তির মালিক হয় না। তাকে সম্পত্তিহীনভাবে জীবন কাটাতে হয়। মাতুয়াতান্ত্রিক উত্তরাধিকারী ছোট মেয়ে মায়ের সকল সম্পত্তির মালিক হয়। ছোট মেয়ে নকমা নামে পরিচিত। তাঁর স্বামীকে বলা হয় নকব্রম। ছোট মেয়ের কদর সবচেয়ে বেশি। নকমার স্বামী হওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। ছেলেরা বিয়ের পূর্বে মায়ের সম্পত্তির প্রতি আগ্রহ দেখায় না। সম্পত্তির মালিকানা ভবিষ্যতে বোসের হাতে বৰ্তাবে এই ভেবে অমনোযোগী থাকে। স্ত্রীর মৃত্যু ঘটলে অনেক সময় বিপত্নীকেক স্বামীকে রিক্ত হস্তে গৃহত্যাগ করতে হয়। তাই পুরুষেরাও সংসারে তেমন মনোযোগী হয় না। বোন ভাইয়ের কাজের অবহেলা এবং অপব্যয় সহ্য করতে চায় না। তাই ভাইকে বিয়ে দেওয়া জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। ছেলে ঘরজামাই হয়ে চলে গেলে মেয়েরা নিজেদের ইচ্ছেমত সংসার সাজায়। পুরুষ স্ত্রীর সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। তিনি স্ত্রীর অনুকম্পিক্রমে কাজ করে থাকেন। তবে যৌথ ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
আজ থেকে পাঁচ-ছয়শত বছর আগে গারোরা পিতৃতান্ত্রিক ছিল। বড় ছেলে সম্পত্তির মালিক হত। ছেলেরা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় এক গোষ্ঠী/পরিবারের সম্পত্তি আরেক গোষ্ঠী/পরিবারে চলে যেত। পরিবারের সম্পত্তি যাতে বাইরে না যায় এজন্য সমাজের ধরন পরিবর্তন করে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ধরে রাখা হয়।
গারো সমাজে একই মাহারীর পুরুষ ও মহিলার বিবাহ নিষিদ্ধ। কারও স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর জন্য নতুন বর নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাহারীর লোকেরা দায়িত্ব পালন করে। এটি আখম প্রথা হিসেবে অভিহিত। বিপত্নীক বা বিধবা কেউ নিজের খেয়াল খুশি মত বিয়ে করতে পারে না। তাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনও টিকে রয়েছে জাতি ব্যবস্থায়। সন্তান পিতার বাপ্তা ব্যবহার না করে মায়ের বাপ্তা ব্যবহার অনুসরণ করে। মায়ের ভাই পিতার সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। প্রতিটি গারো পরিবার একেকটি যৌথ পরিবার তাই ছেলে-মেয়ে শ্বশুর-শ্বাশুড়ী, স্বামী-স্ত্রী, দাদু-দিদিমা নিয়ে পরিবার গঠিত।
বর্তমানের গারো সমাজে কিছুটা পুরুষ তন্ত্রের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মাতৃতান্ত্রিকতায় রাজনৈত্তিক এবং খ্রিষ্টান চার্চের প্রভাবে এখন পরিবারের সিদ্ধান্ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী পুরুষ মিলে যৌথভাবে নিচ্ছেন। ধর্মীয় এবং সৈকতিক সিদ্ধান্ত পুরুষদেরকেই ফায়দা দিয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষার প্রসার, জীবিকার পরিবর্তন, প্রবল ব্যক্তিস্বার্থ প্রভৃতিব ফলে যৌথপরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও শ্বশুর শাশুড়ীও একক পরিবারে স্থান পাচ্ছে না।
বর্তমানে নানা পরিবর্তনশীলতার কারণে মেয়েরা বিবাহ করে স্বামীর বাড়িতে চলে যাচ্ছে এবং অনেকেই যৌথুক্তও গ্রহণ করছে। নানা পরিবর্তন ও প্রতিকূলতার পরেও কোন না কোন মেয়ে সন্তান মাতুসূত্ৰীয় রীতি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিজ্ঞানী হেনরী মেইনের মতে পুরুষতান্ত্রিকতা সমাজের সাৰ্বজনীন এবং মৌলিক একক। গারো সমাজে এর প্রভাব পড়েছে। সবাই এখন নিজ নিজ চিন্তা করছে তাই আর আগের মত সবকিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।
গারো সমাজের আশে পাশে বাঙালি সমাজ চুকে পড়ায় সেই প্রতাঙ্কশ ও পড়ছে গারো নারীদের ওপর। সমাজের নানা অনাচার ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবারের পুরুষদের গুরুত্ব কিছুটা বাড়ছে। গারো জনপদে বহিরাগতদের আগমন এবং বাইরের সংস্কৃতির প্রভাবে তারা পোর্তীক্ষিক এক সঙ্গে থাকতে পচ্ছন্দো ফলে গারো অহ্মায়িত এলাকার বৈশিষ্ঠ হারিয়ে যাচ্ছে। বাইরের সংস্কৃতির প্রভাবে শিক্ষিত গারো ছেলে মেয়েদের কেউ কেউ মায়ের পরিবর্তে বাবার টাইটেল ব্যবহার করছে এবং ছেলেরা ঘরজামাই হতে চাচ্ছে না।
বর্তমানে বাঙালি পরিবারের গারো মেয়েদের বিবাহ, মিশনারী তৎপরতা ও বাঙালিদের আগমনের ফলে গারো নারীদের ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হচ্ছে। নারীরা বহির্মুখী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে ফেলছে নিজেদের আদি ক্ষমতা। তবে গারো সমাজের নানা রীতি পরিবর্তনের ফলে নারীর ক্ষমতা হ্রাস পেলেও তারপরও নারীরাই পরিবারের যাবতীয় কিছু দেখভাল করে এবং তারাই পরিবারের প্রধান। এতে সংসারের কৰ্তৃত্ব নারীদের কাছেই। বাঙালি সমাজে নারী অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হলেও হাজার বছর পূর্বেই গারো সমাজে নারীকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এজন্য তাদের কোন আন্দোলন করতে হয়নি ফলে গারো নারী ক্ষমতার উৎস। তাদের সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার কারণে হাজার বছর আগেও তারা ছিল পুরুষের চেয়ে অগ্রগামী।
বর্তমানে কিছু লোভী মানুষ গারো নকমাদের বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ক্ষমতারদ অসাধু ব্যক্তিরা গারো সমাজে প্রবেশ করে গারোদের আদি বিয়ে পদ্ধতির পরিবর্তন করেছে। অন্য ধর্মের লোকের প্রাদুর্ভাবে গারো সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যের টানাপোড়েন হচ্ছে। আজকের দিনের ছেলেমেয়েদের বাইরের জগত এবং শিক্ষিত হওয়ার প্রেক্ষাপট তাদের চালচিত্রে হাওয়া বদলের ইঙ্গিত থাকলেও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় বর্তমানে তাদের সংস্কৃতি ও আচারে মনোযোগী হতে দেখা যাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায় গারো নারীর নিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মাঝে রয়েছে আপন সত্তা, নারীরা তাদের পরিশ্রমে দিয়ে ঘরে রেখেছে পরিবার ও সমাজের কর্তৃত্ব। সুতরাং আমরা বলতে পারি সমাজ সংসারে অধিকারের প্রশ্নে গারো নারীদের অবদান সত্কিই আছে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রাকৃতিকভাবে তাদের বিকশিত হতে দেয়া উচিত।
লেখক:
ড. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন
গবেষক ও লেখক, আঞ্চলিক পরিচালক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।





