শত শত বৈঠার ছন্দে আবারও মুখরিত ভাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী কুমার নদ
একসময় যে নদীর বুকে শত শত বৈঠার ছন্দে ছুটে চলত রঙিন নৌকা, সেই ঐতিহ্য যেন আবারও প্রাণ ফিরে পেল। দীর্ঘ কয়েক বছর পর ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ঐতিহ্যবাহী কুমার নদে অনুষ্ঠিত হলো জমজমাট নৌকা বাইচ। বৈঠার তালে তালে নৌকার ছুটে চলা আর নদীর দুই পাড়ে হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকাল ঠিক ৩টা ৩০ মিনিট থেকে কুমার নদের বুকে শুরু হয় এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দুইশ বছর ধরে বিশ্বকর্মা পূজাকে কেন্দ্র করে কুমার নদে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই নৌকা বাইচ। এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং ভাঙ্গার মানুষের কাছে এটি দীর্ঘদিনের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। তবে কয়েক বছর ধরে নৌকা বাইচ বন্ধ থাকায় এ আয়োজন থেকে বঞ্চিত ছিলেন স্থানীয়রা।
দীর্ঘ বিরতির পর এবার আবারও সেই পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনায় কুমার নদ ঘিরে তৈরি হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকা বাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হতে থাকেন মানুষ। দুপুর গড়াতেই নদীর তীর পরিণত হয় জনসমুদ্রে। শিশু, কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে নদীর পাড়ে বসে গ্রামীণ মেলা। বিভিন্ন ধরনের খাবার, খেলনা ও নানা পণ্যের দোকান বসায় উৎসবের আনন্দ আরও বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিন পর নৌকা বাইচ ফিরে আসায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীরা। তাদের প্রত্যাশা, শুধু একবার নয়—প্রতিবছরই যেন একইভাবে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহামুদ খৈয়াম । এছাড়াও বিশেষ অতিথি ও নৌকা বাইচের প্রধান আয়োজক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল, পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান শামীমুজ্জামান, জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহারিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী,জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ন আহবায়ক ও ফরিদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন খান পলাশ।
ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্টানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ,উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা, সাংগঠনিক সম্পাদক তৈমুর লং ও বিপুল মুন্সী , প্রচার সম্পাদক মির্জা ইমরান, যুবদলের সভাপতি মোহাম্মদ ওসমান মুন্সী, সাধারণ সম্পাদক গোলাম আযম, ভাঙ্গা উপজেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুল হাসান
পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মুন্সী, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান সহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী নৌকার দলগুলোর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম খান বাবুল সহ অতিথিগন।
নৌকা বাইচ দেখতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, কুমার নদকে ঘিরে এই আয়োজন ভাঙ্গার মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কয়েক বছর পর আবারও বৈঠার ছন্দে নদীকে মুখরিত হতে দেখে তারা আনন্দিত। তাদের প্রত্যাশা, প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পূজাকে ঘিরে আরও বড় পরিসরে এই নৌকা বাইচ আয়োজন করা হবে।
উৎসবে উপস্থিত সচেতন মহলের প্রতিনিধিরাও মনে করেন, আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিতভাবে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের সংযোগ আরও দৃঢ় হবে এবং ভাঙ্গার কুমার নদ আবারও হয়ে উঠতে পারে লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।





